ধর্ম ও জীবন

ইসলামে সম্পদের ব্যবহার ও সুরক্ষার পদ্ধতি

ইসলামী অর্থনীতিকে আরবি ভাষায় ‘ইকতিসাদ’ বলা হয়। যার অর্থ মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। এ নামকরণ থেকেই সম্পদ বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়। ইসলাম একদিকে মানবজীবনে সম্পদের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে, অন্যদিকে সম্পদ-লিপ্সার কুফল তুলে ধরে সাবধান করেছে। মানবজীবনের প্রয়োজনে সম্পদ সুরক্ষায় যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। পবিত্র কোরআনে সম্পদকে কখনো কল্যাণের উৎস, কখনো পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য এবং কখনো ফিতনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সম্পদ সুরক্ষায় ইসলামের বহুমুখী পদক্ষেপ

ইসলাম সম্পদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যাকে কয়েক ভাগে বিভক্ত করা যায়।

বিশ্বাস ও আনুগত্যের জায়গা থেকে

সম্পদ সুরক্ষায় বিশ্বাস ও আনুগত্যের অংশ হিসেবে ইসলামের নির্দেশনা হলো—

আল্লাহর আনুগত্য : ইসলামী বিশ্বাস অনুসারে আল্লাহই সম্পদের প্রকৃত রক্ষক। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর আমি কারুনকে তার প্রাসাদসহ ভূগর্ভে প্রোথিত করলাম। তার স্বপক্ষে এমন কোনো দল ছিল না যে আল্লাহর শাস্তি থেকে তাকে সাহায্য করতে পারত এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিল না।’ (সুরা কাসাস, আয়াত : ৮১)

পরকালীন জবাবদিহি : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসিত না হওয়া পর্যন্ত আদম সন্তানের পা তার প্রতিপালকের সামনে নড়বে না।… তার সম্পদ সম্পর্কে, সে তা কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোন পথে ব্যয় করেছে।…’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৬)

ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে সম্পদ

সম্পদ সুরক্ষায় ব্যক্তিগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে ইসলামের নির্দেশনা হলো—

সম্পদ ব্যয়ে মধ্যপন্থা : সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা হলো ‘তুমি তোমার হাত তোমার ঘাড়ে আবদ্ধ করে রেখো না এবং তা সম্পূর্ণ প্রসারিত করো না। তাহলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে পড়বে।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ২৯)

সম্পদ নষ্ট না করা : সম্পদ নিজের হোক বা অন্যের তা নষ্ট করা ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন, ‘যখন সে প্রস্থান করে, তখন সে পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টির এবং শস্যক্ষেত ও জীবজন্তু ধ্বংস করার চেষ্টা করে। আল্লাহ অশান্তি পছন্দ করেন না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২০৫)

অবৈধ উপার্জন পরিহার করা : ইসলামে ছলচাতুরিসহ যেকোনো অবৈধ উপার্জনকে হারাম করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা পরস্পর নিজেদের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনে-শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার জন্য তা বিচারকদের কাছে পেশ কোরো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৮)

ঋণ পরিশোধ করা : ঋণ পরিশোধ করার তাগিদ দিয়ে মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ ঋণ নেয় পরিশোধ করার উদ্দেশে আল্লাহ তা আদায়ের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে তা নেয় বিনষ্ট করার নিয়তে আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৩৮৭)

সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে

সম্পদ সুরক্ষায় সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে ইসলামের নির্দেশনা হলো—

অসহায় ব্যক্তির সম্পদ রক্ষা : এতিম ও অসহায় ব্যক্তির সম্পদ আত্মসাতের ব্যাপারে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা এতিমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে তারা তাদের পেটে আগুন ভক্ষণ করে; তারা অচিরেই জ্বলন্ত আগুনে জ্বলবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১০)

নির্বোধের হাতে সম্পদ না দেওয়া : আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের সম্পদ, যা আল্লাহ তোমাদের জন্য উপজীবিকা করেছেন তা নির্বোধ মালিকদের হাতে অর্পণ কোরো না; তা থেকে তাদের খাবার ও পোশাকের ব্যবস্থা করবে এবং তাদের সঙ্গে সদালাপ করবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৫)

রাষ্ট্রীয় আইন ও শাস্তি বিধান হিসেবে

সম্পদ সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় আইন ও শাস্তির অংশ হিসেবে ইসলামের নির্দেশনা হলো—

সুদ পরিহার : সুদের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রের আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। ইসলাম সুদ হারাম করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের সম্পদে বৃদ্ধি পাবে বলে তোমরা যে সুদ দিয়ে থাকো, আল্লাহর দৃষ্টিতে তা ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে না। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য যে জাকাত তোমরা দিয়ে থাকো তা-ই বৃদ্ধি পায়, তারাই সমৃদ্ধিশালী।’ (সুরা রোম, আয়াত : ৩৯)

চুরির শাস্তি বিধান : অন্যের সম্পদ চুরি ইসলামের দৃষ্টিতে দণ্ডনীয় অপরাধ। পবিত্র কোরআনে চুরি ঘোষণা করে বলা হয়েছে, ‘পুরুষ চোর এবং নারী চোর, তাদের হাত কেটে দাও। এটা তাদের কৃতকর্মের ফল এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আদর্শ দণ্ড; আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৩৮)

ডাকাতির শাস্তি বিধান : কোরআনে ডাকাতির কঠিন শাস্তি ঘোষণা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায়, এটা তাদের শাস্তি যে তাদের হত্যা করা হবে বা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে অথবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদের দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। পৃথিবীতে এটাই তাদের লাঞ্ছনা ও পরকালে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৩৩)

হিসাব সংরক্ষণ করা : আর্থিক লেনদেন ও ঋণ বিনিময়ের হিসাব সংরক্ষণ করার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা, তোমরা যখন একে অন্যের সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের জন্য ঋণ বিনিময় করো, তখন তা লিখে রেখো। তোমাদের মধ্যে কোনো লেখক যেন ন্যায্যভাবে লিখে দেয়।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৮২)

উত্তরাধিকার প্রদান : নারী-পুরুষ উভয়ের উত্তরাধিকার যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষের অংশ আছে এবং মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীরও অংশ আছে। তা অল্প বা বেশি হোক, এক নির্ধারিত অংশ।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৭)

এভাবেই ইসলাম সম্পদের ব্যবহার ও সুরক্ষার বিধান দিয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button