স্বাস্থ্য

হার্ট অ্যাটাক : প্রাণ বাঁচাতে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘস্থায়ী পদক্ষেপ জরুরি

আমাদের সমস্ত দিন করোনার তাণ্ডবে ঢাকা পড়ে গেছে। গত দেড়টি বছর ঘরের বাইরে ভালো করে শ্বাস নিতে পারি না। ঘরের ভেতরে যদিও শ্বাস নিতে পারি কিন্তু অচেনা ত্রাস এসে দম বন্ধ করে দেবার হুমকি দিয়ে চলেছে। করোনার এই দ্বিমুখী আক্রমণে অন্যান্য রোগব্যাধি দৃশ্যের অন্তরালে চলে গেছে। সবাই আমরা ভেবে বসে আছি যে, ঘাতক ব্যাধিরা আপাতত ছুটি নিয়েছে। আসলে তা মোটেই ঠিক না। ঘাতকব্যাধিরা দল বেঁধে নীরবে তাদের কাজ করে যাচ্ছে। তাই সবাইকে বলবো এদিকেও পর্যাপ্ত সজাগ দৃষ্টি রাখতে।

ভোর ছটায় সিসিইউ থেকে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানালেন যে, চল্লিশ বছরের এক যুবক ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক নিয়ে যশোর থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স করে আমার অধীনে ভর্তি হয়েছেন। বুকে ব্যথা অনুভব করবার পর যশোর শহরের একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখালে তিনি একটি হাসপাতালে ভর্তি করে গত দুদিন ধরে চিকিৎসা দিচ্ছেন। কিন্তু পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকলে রোগীর আত্মীয়স্বজন উন্নত চিকিৎসার আশায় ঢাকায় নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন।

আমার হাসপাতালটি একটি বিশেষায়িত টারশিয়ারি কার্ডিয়াক হাসপাতাল হওয়ায় দিনরাত ২৪ ঘণ্টা একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ কনসালটেন্ট কর্তব্যরত থাকেন। ফলে যেকোনো জরুরি সঙ্কটজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও তাঁরা সহজে ম্যানেজ করতে সক্ষম।
আজকের কর্তব্যরত বিশেষজ্ঞ ডা. জগলুল কবীর রোগীকে দেখে সহজেই বুঝতে পারলেন যে, রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন। প্রেসার নেমে গেছে, হার্টবিট তিরিশের নিচে। তিনি আমাকে ফোন করে দেরি না করে ওটি-তে নিয়ে অস্থায়ী পেসমেকার লাগিয়ে দিলেন। কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না। বারবার হার্টের তাল কেটে (arrhythmia) যাচ্ছে। বার কয়েক বৈদ্যুতিক শক দেয়া হয়ে গেছে। গলায় নল ঢুকিয়ে লাইফ সাপোর্ট স্থাপন করা হয়েছে।

আমি এন৯৫ এর কষ্টদায়ক মাস্ক পরে দ্রুত হাসপাতাল অভিমুখে রওনা দিলাম। সিসিইউ-তে পৌঁছে বুঝলাম যে, আমার হাতে করবার মতো আর কিছু বাকি নেই। চল্লিশ বছরের সুঠাম দেহের অধিকারী একটি যুবক জীবনমৃত্যুর কঠিন সুতোয় ঝুলে আছে। পাশে তাঁর আতঙ্কিত স্ত্রী আর হরিণশাবকের মত ভীতবিহ্বল তাঁদের কিশোরী মেয়েটি! একদিকে একটি অসম্পূর্ণ জীবনের নিরুদ্দেশ যাত্রা আর পেছনে দাঁড়িয়ে দুটি অসমাপ্ত জীবনের বাকরুদ্ধ হাহাকার!

যশোর থেকে নিয়ে আসা ইসিজি, রক্তের পরীক্ষার রিপোর্ট সব নিরীক্ষা করলাম। বুকে ব্যথা অনুভূত হবার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের চেম্বারে যান। ডাক্তার সাহেব ইসিজি করে বুঝতে পারেন, ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক (Acute STEMI Anterior) । অর্থাৎ রোগীর হার্টের একটি মেজর রক্তনালী রক্তের দলা জমে বন্ধ হয়ে গেছে।

প্রশ্ন হলো বন্ধ হওয়া রক্তনালীর চিকিৎসা কী? উত্তর খুব সহজ। বন্ধ হওয়া রক্তনালী খুলে দিতে হবে। কীভাবে খুলতে হবে? উত্তর হলো : দুটো উপায় আছে।

১। জরুরি অ্যানজিওগ্রাম করে রক্তের দলা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে বেলুন এবং রিং ( primary angioplasty) এর সাহায্যে রক্তের দলা দ্রুত অপসারণ করা। হার্ট অ্যাটাকের এটিই হল সবচেয়ে আধুনিক স্বীকৃত উপায়। এর সফলতার হার শতকরা ৯৫ ভাগের বেশি। কিন্তু এটি করতে হলে রাউন্ড দ্য ক্লক বিশেষজ্ঞ টিম এবং বিশেষায়িত কার্ডিয়াক হাসপাতাল দরকার। আমরা জানি যে, যশোরে সেটি এই মুহূর্তে নেই। কিন্তু কাছাকাছি দেড় ঘণ্টার দূরত্বে খুলনা শহরে সেটি আছে। রোগী সামর্থ্যবান। সুতরাং তাঁকে সেখানে রেফার করা যেত। কিন্তু পাঠানো হয়নি। তাহলে যশোরে বিকল্প চিকিৎসা কী ছিল? সেটি কি দেয়া হয়েছিল? না হয়নি।

২। এবার জানবো দ্বিতীয় বিকল্প আধুনিক চিকিৎসা কী? উত্তর হলো জমে যাওয়া রক্তের দলা গলিয়ে ফেলবার শক্তিশালী ওষুধ পাওয়া যায়। রক্তের দলা বা thrombus গলাবার ওষুধকে thrombolytic বলা হয়। সবচেয়ে সস্তা এবং সহজলভ্য হলো Streptokinase যা দেশের প্রায় অধিকাংশ জেলায় পাওয়া যায়। বুকে ব্যথা হবার ১২ ঘণ্টার মধ্যে দিতে পারলে ফল পাওয়া যায়। যত তাড়াতাড়ি দেয়া যাবে তত ভালো ফল পাওয়া যাবে। এটি একটি জীবনরক্ষাকারী মহৌষধ। শতকরা প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ ক্ষেত্রে এটি সফল। এরচেয়েও অধিক শক্তিশালী হলো Tenectiplase যা শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ সফল। কিন্তু এটির দাম বেশি, তাই সবজেলায় পাওয়াও দুস্কর। তবে যশোর তো একটি অগ্রসর শহর । এয়ারপোর্ট আছে, চকচকে বিপনীবিতান, ধনবান লোকদের বসবাস। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাটা নিশ্চিত করবার কেউ নেই ।

কী করা উচিত?
১। প্রত্যেক জেলা শহরে আধুনিক চিকিৎসার কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। অন্তত ১০ শয্যার সিসিইউ এবং ১০ শয্যার আইসিইউ সরকারের তত্ত্বাবধানে গড়ে তুলতে হবে। প্রত্যেক জেলা শহরে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পদ রয়েছে। সেগুলোতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল নিয়োগ দিতে হবে। জীবনরক্ষাকারী Streptokinase injection বিনামূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
২। প্রত্যেক বিভাগীয় শহরে জরুরি অ্যানজিওপ্লাস্টি বা রিং বসাবার মতো যোগ্য ওটি এবং লোকবল নিয়োগ দিতে হবে। ২৪ ঘণ্টা হার্ট টিম প্রস্তুত রাখতে হবে।
৩। প্রত্যেক বিভাগীয় শহরে ওপেন হার্ট সার্জারি করবার মতো ওটি তৈরি এবং দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে।
৩। হার্ট অ্যাটাকের দুই ঘণ্টার মধ্যে কোনো কেন্দ্রে (যেমন-খুলনায় ) জরুরি অ্যানজিওপ্লাস্টি সম্পন্ন করা সম্ভবপর হলে সেখানে রেফার করতে হবে। তা সম্ভব না হলে injection Streptokinase দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রিং ( Stenting) বসানো যায় এমন কেন্দ্রে পাঠাতে হবে।
মনে রাখতে হবে হার্ট অ্যাটাক হলো এক নম্বর মরণব্যাধি । যত মৃত্যু হয় তার মধ্যে সর্বোচ্চ হলো হার্ট অ্যাটাকজনিত। এখানে মুখ্য নিয়ামক হলো সময়। ১২ ঘণ্টা পার হলে আর লাভ হবে না।

লেখক : সিনিয়র কার্ডিওলজিস্ট, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হসপিটাল, ধানমন্ডি, ঢাকা । সূত্র: বিডি প্রতিদিন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button