• শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৮ অপরাহ্ন

নড়াইলে এইচএসসির ফল বিপর্যয়: দায় এড়ানোর সুযোগ নেই, শিক্ষার মানোন্নয়নে চাই কার্যকর উদ্যোগ

adminRajib
আপডেটঃ : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
সম্পাদক-মোঃ-রাজিবুল-ইসলাম-নড়াইল
মোঃ রাজিবুল ইসলাম (রাজিব), সম্পাদক, নড়াইল সংবাদ

আজকের সম্পাদকীয়:
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার মান ও শিক্ষার্থীদের দক্ষতার ওপর। কিন্তু নড়াইল জেলায় এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে নতুন করে ভাবনার সময় এসেছে। পাসের হার কমে যাওয়া শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা নয়, বরং আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, কেন শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত ফলাফল করতে পারছে না? কোথায় ঘাটতি রয়েছে? আর এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায়ই বা কী?

২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সারাদেশে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত বছরের ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশের তুলনায় ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট কম। যশোর শিক্ষা বোর্ডেও পাসের হার কমেছে। গত বছর এই বোর্ডে পাসের হার ছিল ৫০ দশমিক ২০ শতাংশ, এবার তা কমে ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। নড়াইল জেলা যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীন হওয়ায় এ ফলাফল জেলার শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে। নড়াইল জেলায় এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার মাত্র ৩৬.৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ জেলার অর্ধেকেরও বেশি পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। এ ফলাফল জেলার শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

কেন কমছে পাসের হার?

প্রথমত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান ও শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অনেক শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষের পাঠের চেয়ে প্রাইভেট ও কোচিংয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফলে প্রকৃত শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল থেকে যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, ইংরেজি, গণিত ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে ইংরেজি বিষয়ে ভিত্তি দুর্বল থাকায় অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো করতে পারছে না।

তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন বিনোদনে অতিরিক্ত সময় ব্যয়ের প্রবণতা পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নিয়মিত অধ্যয়ন, অনুশীলন ও পরীক্ষার প্রস্তুতির অভাবও ফলাফল খারাপ হওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।

চতুর্থত, শিক্ষকদের পাঠদানের পদ্ধতি, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি যথাযথ মনোযোগ কতটা রয়েছে, তা মূল্যায়ন করা জরুরি। শুধু পাঠ্যবই শেষ করাই শিক্ষকের দায়িত্ব নয়; শিক্ষার্থীরা কতটুকু বুঝতে পারছে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

দায় কার, সমাধান কোথায়?

এই ফলাফলের দায় শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষা প্রশাসন—সব পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে।

নড়াইল জেলার যেসব কলেজে পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের ফলাফল আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, শিক্ষকদের পাঠদানের অবস্থা কী, নিয়মিত ক্লাস হয়েছে কি না এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার কত ছিল—এসব বিষয়ে তদন্ত ও পর্যালোচনা প্রয়োজন।

প্রয়োজনে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাস, বিষয়ভিত্তিক অতিরিক্ত পাঠদান, নিয়মিত মডেল টেস্ট এবং অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা প্রশাসনকে শুধু পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর নয়, সারা বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম তদারকি করতে হবে।

শিক্ষার মান ফিরিয়ে আনতে এখনই উদ্যোগ প্রয়োজন
নড়াইল একটি সম্ভাবনাময় জেলা। এ জেলার শিক্ষার্থীদের মেধা ও সম্ভাবনার অভাব নেই। প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা, মানসম্মত পাঠদান এবং উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ। ভালো ফলাফলের জন্য শুধু পরীক্ষার আগে বিশেষ প্রস্তুতি নয়, সারা বছর ধরে শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা মনে করি, নড়াইল জেলার শিক্ষা প্রশাসনের উচিত দ্রুত একটি সমন্বিত মূল্যায়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা। প্রতিটি কলেজের ফলাফল পর্যালোচনা করে দুর্বলতার কারণ চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করছে, তাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠদানের কৌশল অন্য প্রতিষ্ঠানে অনুসরণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অবহেলা করার সুযোগ নেই। ফলাফল খারাপ হলে শুধু শিক্ষার্থীদের সমালোচনা নয়, শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে নিজের ভূমিকা পর্যালোচনা করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, পাসের হার বাড়ানোই শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য নয়; প্রকৃত শিক্ষিত, দক্ষ ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তোলাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। নড়াইলের শিক্ষার মানোন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

মোঃ রাজিবুল ইসলাম (রাজীব)

সম্পাদক

নড়াইল সংবাদ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো নিউজ