সম্পাদকীয়
একটি সুন্দর, নিরাপদ ও মানবিক সমাজ গড়তে হলে অপরাধমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কিন্তু উদ্বেগের বিষয়, নড়াইল জেলাতেও মাদক ও অনলাইন প্রতারণার মতো সামাজিক অপরাধ নিয়ে জনমনে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। মাদকের ভয়াল ছোবলে বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকিতে তরুণ সমাজ, অন্যদিকে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অনলাইন প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অর্থ ও ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার প্রবণতা সমাজের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে ধ্বংস করে না, ধ্বংস করে একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। বিশেষ করে তরুণ বয়সে কেউ মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়লে তার শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন ও স্বাভাবিক জীবনযাপন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে কেউ কেউ চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে মাদকাসক্তির প্রভাব শুধু ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে পরিবার ও সমাজের প্রতিটি স্তরে।
নড়াইলের মতো সম্ভাবনাময় একটি জেলায় তরুণদের বড় একটি অংশকে শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা জরুরি। মাদক নির্মূলে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না, মাদকের উৎস, সরবরাহকারী, বিক্রেতা ও পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে মাদকাসক্তদের অপরাধী হিসেবে অবহেলা না করে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে প্রযুক্তির সহজলভ্যতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অনলাইন প্রতারণার ঝুঁকি। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ভুয়া অনলাইন শপ, মোবাইল ব্যাংকিং এবং বিভিন্ন আকর্ষণীয় অফারের ফাঁদে পড়ে অনেক মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। কখনো চাকরির প্রলোভন, কখনো অনলাইন কেনাকাটায় কম দামের প্রস্তাব, আবার কখনো পুরস্কার বা লটারি জেতার কথা বলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক প্রতারক ভুয়া পরিচয়, নকল ফেসবুক আইডি ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করছে। কেউ আত্মীয়স্বজনের পরিচয় দিয়ে টাকা চাইছে, কেউ আবার অনলাইন ব্যবসার নামে অগ্রিম অর্থ নিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দিচ্ছে। এসব প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক মানুষ আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সামাজিক ও মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত হচ্ছেন।
অনলাইন প্রতারণা প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের সচেতনতার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাইবার অপরাধ দমন কার্যক্রম আরও গতিশীল করা প্রয়োজন। প্রতারণার অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ, ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ এবং অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও অপরিচিত কাউকে টাকা পাঠানো, ওটিপি, পিন কিংবা ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গোপন তথ্য শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
আমরা মনে করি, মাদক ও অনলাইন প্রতারণা দুটি ভিন্ন ধরনের অপরাধ হলেও এর মূল শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসচেতনতা, অপরাধপ্রবণতা এবং যথাযথ সামাজিক প্রতিরোধের অভাব। তাই এই দুই সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে প্রশাসন, পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
নড়াইলের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী
সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করা, নিয়মিত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন করা এবং তরুণদের কর্মমুখী প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে মাদকবিরোধী কমিটি গঠন করে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা যেতে পারে।
আমরা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে প্রত্যাশা করি, মাদক কারবারি ও অনলাইন প্রতারকদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আপস না করে নিরপেক্ষ ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে কাউকে হয়রানি বা মিথ্যা অভিযোগের শিকার করা যাবে না; প্রতিটি অভিযোগের যথাযথ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, শুধু আইন প্রয়োগ করে একটি অপরাধমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন পরিবার থেকে সচেতনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নৈতিক শিক্ষা এবং সমাজের প্রতিটি মানুষের দায়িত্বশীল ভূমিকা।
নড়াইল আমাদের, নড়াইলের ভবিষ্যৎ আমাদের সন্তানদের। তাই মাদকমুক্ত, প্রতারণামুক্ত ও নিরাপদ নড়াইল গড়ার দায়িত্বও আমাদের সবার। এখনই সময় সচেতন হওয়ার, প্রতিবাদ গড়ে তোলার এবং সম্মিলিতভাবে অপরাধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর।
মোঃ রাজিবুল ইসলাম (রাজিব)
সম্পাদক
নড়াইল সংবাদ