সম্পাদকীয়
মাদক একটি পরিবারকে নিঃস্ব করে, একটি সমাজকে দুর্বল করে এবং একটি প্রজন্মের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দিতে পারে। যে তরুণদের হাত ধরে একটি দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হওয়ার কথা, সেই তরুণদের একটি অংশ যদি মাদকের ভয়াবহ ছোবলে বিপথগামী হয়ে পড়ে, তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সংকট নয়; এটি গোটা সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। নড়াইল জেলার বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় মাদকের বিস্তার ও যুবসমাজের একটি অংশের মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।
নড়াইল একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা। শিল্প-সংস্কৃতি, ক্রীড়া, শিক্ষা ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য এ জেলার পরিচিতি রয়েছে। অথচ এই জেলার তরুণদের একটি অংশ মাদকের সংস্পর্শে আসছে—এমন অভিযোগ ও উদ্বেগ বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম, হাটবাজার থেকে জনবসতিপূর্ণ এলাকা—কোথাও মাদকের বিস্তার নিয়ে অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা জরুরি। কারণ মাদক কখনো একদিনে একটি সমাজকে গ্রাস করে না; ধীরে ধীরে এটি মানুষের বিবেক, কর্মক্ষমতা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক মূল্যবোধকে দুর্বল করে দেয়।
মাদকাসক্তির পেছনে একাধিক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। বেকারত্ব, হতাশা, অসুস্থ বন্ধুমহল, পারিবারিক অশান্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব, মাদকের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার—এসব বিষয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে তরুণদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
বিশেষ করে কৈশোর ও তরুণ বয়সে কৌতূহল, বন্ধুদের প্রভাব এবং ভুল সিদ্ধান্তের কারণে কেউ কেউ প্রথমবার মাদকের সংস্পর্শে আসে। পরবর্তী সময়ে তা নির্ভরশীলতায় রূপ নিতে পারে। তখন শিক্ষাজীবনে অনিয়ম, কর্মজীবনে ব্যর্থতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আর্থিক সংকট এবং অপরাধপ্রবণতার ঝুঁকি বাড়ে।
তবে মনে রাখতে হবে, মাদকাসক্ত ব্যক্তি শুধু অপরাধী নয়; অনেক ক্ষেত্রে তিনি চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও সামাজিক পুনর্বাসনের প্রয়োজন রয়েছে এমন একজন মানুষ। তাই মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন—দুটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
মাদক কেনাবেচা এবং মাদক সংগ্রহের জন্য অর্থের প্রয়োজন অনেক সময় অপরাধপ্রবণতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। চুরি, ছিনতাই, পারিবারিক সহিংসতা, প্রতারণা ও নানা সামাজিক বিশৃঙ্খলার সঙ্গে মাদকের সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় আলোচিত হয়েছে। তবে প্রতিটি অপরাধের পেছনে মাদককে একমাত্র কারণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
নড়াইলের কোথাও মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ কিংবা তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি করা যাবে না। মাদকবিরোধী অভিযান হতে হবে তথ্যনির্ভর, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক।
মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন ধারাবাহিক, পরিকল্পিত ও সমন্বিত কার্যক্রম।
নড়াইল জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। মাদকের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বিশেষ করে—
১. মাদকপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারি ও আইনানুগ অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
২. মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের পরিচয় ও কর্মকাণ্ড তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করতে হবে।
৩. মাদক পাচার ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িত নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
৪. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করতে হবে।
৫. মাদকাসক্তদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে।
৬. মাদকবিরোধী কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
একটি শিশুর প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার পরিবার। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে, তার আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে।
সন্তান ভুল পথে গেলে তাকে অপমান, অবহেলা কিংবা সামাজিকভাবে একঘরে না করে সহানুভূতির সঙ্গে সঠিক চিকিৎসা ও পরামর্শের ব্যবস্থা করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও নিয়মিত মাদকবিরোধী আলোচনা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ক্রীড়া কার্যক্রম আয়োজন করা প্রয়োজন। শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমন্বিত সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
তরুণদের শুধু মাদক থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানালেই হবে না; তাদের সামনে সুস্থ ও ইতিবাচক জীবন গড়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, কারিগরি প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ বাড়াতে হবে।
নড়াইলের বিভিন্ন এলাকায় খেলার মাঠ ও ক্রীড়া সংগঠনগুলোকে সক্রিয় করা প্রয়োজন। তরুণদের জন্য পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ এবং কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো জরুরি। একজন তরুণ যখন নিজের যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে, তখন তার সামনে ইতিবাচক পথ তৈরি হয়।
মাদকবিরোধী লড়াই শুধু পুলিশ বা প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়। জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন, শিক্ষক, সাংবাদিক, ধর্মীয় নেতা, অভিভাবক এবং সচেতন নাগরিক—সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে সামাজিক সচেতনতামূলক কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তবে এসব কমিটির কার্যক্রম হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং আইনসম্মত। কারও বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ ছড়ানো কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার সুযোগ যেন তৈরি না হয়।
সাংবাদিকদেরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। মাদকবিরোধী সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ইতিবাচক উদ্যোগ, প্রশাসনের কার্যক্রম এবং সমস্যার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হবে।
আমরা এমন একটি নড়াইল দেখতে চাই, যেখানে তরুণদের পরিচয় হবে তাদের মেধা, শিক্ষা, কর্মদক্ষতা, খেলাধুলা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে; মাদকের সঙ্গে নয়। আমরা চাই না কোনো পরিবার তার সন্তানকে মাদকের কারণে হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাক। চাই না কোনো সম্ভাবনাময় তরুণ মাদকের কারণে নিজের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে ফেলুক।
এখনই সময় মাদকের বিরুদ্ধে সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার। প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ, পরিবারের সচেতনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং সামাজিক আন্দোলনের সমন্বয় ঘটাতে হবে।
মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, আর মাদকাসক্তদের ফিরিয়ে আনতে হবে চিকিৎসা, ভালোবাসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে।
মনে রাখতে হবে, আজকের তরুণরাই আগামী দিনের নড়াইল। তাদের রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রজন্মকে রক্ষা করা নয়, বরং নড়াইলের ভবিষ্যৎ, সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নের পথকে সুরক্ষিত করা। মাদকের বিরুদ্ধে এখনই জেগে উঠতে হবে—নইলে এর মূল্য দিতে হবে আগামী প্রজন্মকে।
মোঃ রাজিবুল ইসলাম (রাজিব)
সম্পাদক
নড়াইল সংবাদ